Harisur's Weblog (http://harisur.blogspot.com/)

আপনাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ

Posted by: Harisur on: October 8, 2008

পর পর দু’বার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় পরম স্বসিত্ম অনুভব করল গাজী জাফর। শুধু স্বসিত্ম নয়, নিজেকে রীতিমত নিরাপদ মনে হলো তার। সেবার মাত্র পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে ফেল করেছিল বলে আফশোসের অনত্ম ছিল না। এবার নমিনেশন পেপার বাতিল হওয়ায় পরম সনেত্মাষ বোধ করল সে। দু’হাত তুলে মোনাজাত কলে বলল, হে আলস্নাহ! তুমি বড়ই মেহেরবান! তোমার শান বোঝা নাদান মানুষের কাজ নয়। তোমার অপার রহমতে এ যাত্রা নিদারম্নণ বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া গেছে। তুমি যা করো সবই মঙ্গলের জন্য করো। ভবিষ্যতেও তোমার রহমত থেকে যেন বঞ্চিত না হই। দেশে জরম্নরি অবস্থা জারিতে আমি যেন বিপদগ্রসত্ম না হই পরোয়ার দেগার!

গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর মসজিদে মিলাদ দিয়েছে গাজী জাফর। অন্যদিকে সেদিন সকালে তার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী মির্জা মাসুমকে বাড়ি ঘেরাও করে আটক করা হয়েছে। তিন তিনটা ত্রাণের শাড়ি পাওয়া গেছে তার বাড়ি তলস্নাশী করে। একটা শাড়ি অবশ্য কাজের বুয়ার পরণে ছিল। কিন্তু এমপি সাহেবের বাড়ির কাজের লোক সরকারি ত্রাণের শাড়ি পরবে কেন? এটা অবশ্যই স্বজনপ্রীতির নিদর্শন। বাকী দুটো ‘শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ’ সিলমারা শাড়ি যে আত্মসাতের আলামত তা বলে দিতে হয় না। এমপি হয়ে জনগণের জিনিস তসরূপ করার মজা বোঝ এবার! সংসদ নির্বাচন গাজী জাফরকে বার বার হারিয়ে খুব বাড় বেড়েছিল মির্জা মাসুমের। এখন জেলের ভাত খেতে হচ্ছে তাকে।

শুধু মির্জা মাসুম নয়, অসংখ্য মন্ত্রী, এমপি ও রাজনীতিবিদকে ধরে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জেলখানা এখন কানায় কানায় পূর্ণ। এরা সবাই যে দুর্নীতিবাজ সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে সম্পত্তির হিসাব দিতে বলা হয়েছে তাদের। হিসাবে গরমিল পাওয়া গেলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। গরমিল না পাওয়া গেলে আয়ের উৎস জানাতে হবে। সেটা সনেত্মাষজনক কিনা, তা কর্তৃপড়্গ সিদ্ধানত্ম নেবে। এ পর্যনত্ম সনেত্মাষজনক আয়ের উৎস তো দূরের কথা, গরমিল ছাড়া কোন হিসাবই পাওয়া যায়নি। এসব গরমিলের হিসাব মেলাতে তদনত্মকারী কর্মকর্তাদের দিন-রাত হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তার প্রধান মোসাহেব ও সার্পোটার আবু গালিব উৎফুলস্ন চিত্তে বলল, লিডার! বলেছিলাম না ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। দেখলেন তো এবার?

আমি তো ধর্মের কলই দেখতে পাচ্ছি না।
সেটা অবশ্য চোখে দেখা যায় না। আমতা আমতা করল আবু গালিব, ঘটনা থেকে বুঝে নিতে হয়।
ঠিক আছে। সময় হলে এ বিষয়ে আমাকে তালিম দিও।
কি যে বলেন লিডার!
তুমি বারবার আমাকে লিডার লিডার করছ। কেউ শুনে ফেলবে। আজকাল রাজনীতিবিদ পরিচয় জানলে মহা ঝামেলা। প্রথমে সম্পত্তির হিসাব চাইবে। তারপর জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের বিরম্নদ্ধে মামলা করবে। একই সাথে চলবে কর ফাঁকির মামলা। তুমি তো জানোই আমার সাদা টাকার চেয়ে কালো টাকাই বেশি।

কথাটা শুনে জিভ কামড়ে ধরে আবু গালিব বলল, ও কথা মুখে আনবেন না স্যার! আপনার কোন কালো টাকাই নেই। যা আছে সবই বৈধভাবে উপার্জিত অপ্রদর্শিত আয়। সব সরকারই কিছু জরিমানা দিয়ে এসব অর্থ হালাল করে দেয়।

সব সরকার আর এখনকার সরকার কি এক?
আবু গালিব এদিক ওদিক তাকিয়ে কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল, ওপর থেকে যাই মনে হোক, তলে তলে আসলে এক।

আবু গালিবকে খুব পছন্দ করে গাজী জাফর। দূর সম্পর্কের শালা বলে হয়ত একটু মেজাজ মর্জি মেনে কথা বলে, কিন্তু যা বলে সবই খাঁটি সোনার মতো নিখাঁদ। রাজনৈতিক বিষয়ে ওর জ্ঞান অসাধারণ। গাজী জাফর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তাকে ‘পলিটিক্যাল এডভাইজার টু এমপি’ নামে একটি পদ দেয়ার কথা ভেবেছিল। কথাটা জানিয়েছিল তাকে। কিন্তু কোথা থেকে কি হয়ে গেল! নির্বাচনের আগে আবু গালিব অবশ্য পরামর্শ দিয়েছিল বড় রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন না পেলে নির্বাচনে না দাঁড়াতে। মনোনয়ন পাওয়ার জন্য পঞ্চাশ লাখ টাকা বাজেটও ঠিক করে ছিল গাজী জাফর। কিন্তু এক কোটি টাকা খরচ করে মনোনয়ন ছিনিয়ে নিয়েছিল মির্জা মাসুম। সেবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যারা নির্বাচিত হয়েছিল তাদের মধ্যে নাম ছিল মির্জার। কূটকৌশল করে গাজী জাফরের নমিনেশন পেপারটাই বাতিল করে দিয়েছিল সে। কিন্তু এখন তার আমও গেছে, ছালাও গেছে।

আবু গালিব অবশ্য তাকে বুঝিয়েছে আগের দু’বার নির্বাচনে পরাজিত হয়ে একটা পলিটিক্যাল ক্যারিয়ার তৈরি হয়েছে গাজী জাফরের। এবার তার নির্বাচিত হওয়ার একশ ভাগ চান্স ছিল। নির্বাচন হলে কথাটা সত্য প্রমাণিত হতে পারত। সব কিছুর পরও আলস্নাহর মার বলে একটা কথা আছে। মির্জা মাসুম সেই মারটা খেয়েছে।

বাতিল নির্বাচনের আগে নিজের ছবি দিয়ে একটা নেমকার্ড ছেপেছিল গাজী জাফর। তাতে নামের নীচে লেখা ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও জনদরদী নেতা। আজকাল ঐ কার্ডের জন্য মাঝে মাঝে ঘুম আসে না তার। এর কারণ মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট খানা আসল নয়। ঐ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি করত সে। বাহাত্তর সনে দেশে ফিরে একটা সার্টিফিকেট যোগাড় করে নিয়েছিল। এসব বিষয়ে তদনত্ম হলে ঝামেলা বেধে যাবে। তাছাড়া জনদরদী নেতা কথাটির সূত্র ধরে কেউ যদি তাকে রাজনীতিবিদ হিসাবে চিহ্নিত করতে চায়, তাহলে মহাবিপদ। রাজনীতিবিদদের জন্য এখন দুর্যোগ চলছে! নিজেকে রাজনীতিবিদ বা নেতা হিসাবে পরিচয় দিতে চায় না সে।

আবু গালিব পরার্মশ দিয়েছে নতুন করে আরেকটা নেমকার্ড ছাপাতে। ওতে তার ছবির তলে লেখা থাকবে সভাপতি, জাতীয় সুশীল সমাজ। সুশীল সমাজের অর্থ যে কি, তা মাথায় আসে না তার। তবে নতুন সরকার সুশীল সমাজকে খুব পাত্তা দেয়। আবু গালিবের মতে সুশীল সমাজকে নিয়ে একটা পার্টি করতে পারলে মন্দ হয় না। তবে উদ্দেশ্য যা-ই থাক, তাকে কোনভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলা সঙ্গত হবে না। ভবিষ্যতে চতুর্থ দফা নির্বাচনে দাঁড়তে গেলে এই সংগঠন কাজে লাগবে।

রাজনীতিবিদদের জন্য এখন বড় দু:সময়। অনেককেই মদের বোতল, ত্রাণের টিন, ত্রাণের শাড়ি, হরিণ, কুমির ইত্যাদি পজেশানে রাখার জন্য ধরা হচ্ছে। দুটো হরিণ ছিল গাজী জাফরের বাড়িতে। সুন্দরবন থেকে ধরে এনে একজন তাকে উপহার দিয়েছিল। ওদের জন্য বাড়ির এক পাশে ঘর বানিয়ে দিয়ে ছিল সে। হরিণ রাখার দায়ে একজন এমপিকে গ্রেফতার করার পরপরই রাতের অন্ধকারে গাজী জাফর হরিণ দুটোকে বাড়ির বাইরে পাচার করে দিল। আর কি কি বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করা হতে পারে, তা নিয়ে রীতিমত ফাঁপরে পড়ে গেল সে।

আবু গালিব বলল, স্যার! আপনার বাড়িতে দুটো খরগোশ আছে না?
আছে।
সর্বনাশ! সে দুটোকে এড়্গুণি জবাই করে খেয়ে ফেলুন।
ওরা আমার ছেলের খুব আদরের। গাজী জাফর প্রশ্ন করল, ওদের নিয়ে সমস্যা কি? ওরাও কি বন্যপ্রাণী?

মানুষ ছাড়া আর সবই এখন বন্যপ্রাণী। আবু গালিব সবজানত্মার মতো বলল, উটপাখি কিংবা ক্যাঙ্গারম্নও আপনি বাসায় রাখতে পারবেন না। ওরা মরম্নভূমির প্রাণী হলে কি হবে, সরকারের আইনে ওরাও বন্যপ্রাণী। বন্যপ্রাণী সংরড়্গণ আইন দারম্নণ কড়া। দেখছেন না মন্ত্রী এমপিকে পর্যনত্ম এই আইনে জেলে ঢোকানো হচ্ছে।

এরপর আর কথা চলে না। খরগোশ দুটোরও বিহিত করা হল।
একদিন ড্রইংরম্নমের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে সহসা আর্তনাদ করে উঠল আবু গালিব, একি!
আবার কি হল? বিব্রত গাজী জাফর তার মুখের দিকে তাকাল।
আপনার ড্রইংরম্নমের দেয়ালে বাঘের চামড়া ঝুলিয়ে রেখেছেন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
হ্যাঁ! ওটা আমার দাদার আমলের। তিনি বাঘটা মেরেছিলেন।
এই বাঘই আপনার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। ব্যাঘ্র হত্যা মহাপাপ, তা জানেন? তাও আবার রয়েল বেঙ্গল টাইগার!
বাঘ তো আমি মারিনি। আমার দোষ কি?
আপনি বাঘ না মারলেও আপনার দাদার অপরাধের কারণে আপনার শাসিত্ম হতে পারে।
এটা কি রকম আইন?
আইন নিয়ে কথা বলবেন না। ‘কম্পটেম্পট অব কোর্ট’ হয়ে যাবে। মির্জা মাসুম বলল, স্বামীর অপরাধে স্ত্রীর যদি তিন বছর করে সাজা হতে পারে, দাদার অপরাধে নাতির দশ বছরের সাজা হতে দোষ কোথায়? বিশেষত রক্তের সম্পর্ক যেখানে!

বাঘের চামড়াটা দেয়াল থেকে ফেলতে হল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল তাতে। দাদার সাহসিকতার নিদর্শন দেখে নিজেরও গৌরব বোধ হত। গাজী জাফর ভাবল, দেয়ালের শূন্য স্থানে মৃত বাঘের চামড়ার ছবি টানিয়ে রাখবে সে। অনত্মত দাদার স্মৃতি মনে জাগরূক রাখার জন্য।

নানা রকম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে দিনগুলো পার হয়ে যাচ্ছে। তালিকা করে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের ধরে ধরে জেলে পাঠানো হচ্ছে। জেলগুলো ভিআইপি বন্দীদের পদচারণায় মুখর। অনেক জেলে আসামী উপচে পড়ছে। এমন অবস্থা দেখে গাজী জাফর মনে মনে রাজনীতির খাতা থেকে নিজের নাম কাটিয়ে ফেলল। কিনত্ম ব্যবসায়ীদের তালিকা থেকে নাম কাটাবে কি ভাবে? বিশেষত তার ব্যবসা হচ্ছে চাল ডাল ও তেলের আড়ৎদারী। এসব ব্যবসায়ীরা এখন সরকারের চোখে সন্দেহভাজন। তাদের সকলকেই অদৃশ্য সিন্ডিকেটের হোতা বলে মনে করা হয়। অনেককেই কারণে-অকারণে যৌথবাহিনীর লোকেরা ধরে নিয়ে গেল। তারপরও চাল ডাল তেলের মূল্য দাম কমছে না। এমন একটা দুযোর্গপূর্ণ অবস্থায় নিজের ভোল পালটে ফেলল গাজী জাফর। সরকারকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য আরো কয়েকজন ব্যবসায়ী নিয়ে চাল ডাল তেলের দাম কম নেয়ার ঘোষণা দিল। তবে কোত্থেকে সেগুলো কম দামে পাওয়া যাবে, তা বলা হল না। ওদিকে টিভি চ্যানেলগুলো ফলাও করে তাদের উদ্যোগের সচিত্র সংবাদ পরিবেশন করল। গাজী জাফর মনে মনে ভাবল, টিভির মতো পত্রিকার সাংবাদিকদেরও হাজার টাকার খাম ধরিয়ে দিতে হবে। সময়টা খুব খারাপ। এ সময়ে গা বাঁচিয়ে চলতে পারলেই ভাল। আর গা বাঁচাতে হলে সাংবাদিক ও সরকারী লোকদের সঙ্গে গায়ে গায়ে ভাব জমাতে হবে। মোটামুটিভাবে গাজী জাফর তাতে সাফল্য অর্জন করল।

এরমধ্যে ঘটল এক ঘটনা। তিনজন বিশেষ ব্যক্তি একদিন এসে দেখা করল তার সঙ্গে। তাদের মধ্যে সিনিয়রজন বলল, আমরা চাঁদা আদান-প্রদানের ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।
চাঁদা প্রসঙ্গ তোলায় বিপদের গন্ধ পেল গাজী জাফর। বলল, আমি কারো কাছ থেকে কখনো চাঁদা নিইনি।

তার এহেন ভয়ার্ত প্রতিক্রিয়ায় একসঙ্গে হেসে উঠল তারা তিনজনই। এবার কনিষ্ঠজন বলল, আপনি যে কারো কাছ থেকে চাঁদা নেননি তা আমরা জানি। কিন্তু আপনি চাঁদা তো দিয়েছেন?

কাকে চাঁদা দিয়েছি?
ওরা তিনজন পরস্পরের মুখ চাওয়াচাউয়ি করল। পরে মধ্যবর্তীজন জানাল, আপনি মির্জা মাসুমকে চাঁদা দিয়েছেন।
ঐ ব্যাটাকে চাঁদা দেব আমি?

কেন? তাকে চাঁদা দিতে দোষ কি? সিনিয়রজন বলল, চাঁদার ব্যাপারে আপনাদের দু’জনের বিরম্নদ্ধেই অভিযোগ আনা যায়। মির্জা মাসুম যদি আপনাকে চাঁদা দেয়ার মামলা ঠুকে দেয়, তাহলে আপনার জন্য খুব খারাপ হবে। তার চেয়ে আপনি মির্জা মাসুমের বিরম্নদ্ধে চাঁদা নেয়ার মামলা রম্নজু করে দিন। এক লড়্গ টাকার চাঁদা। আমরা কেস চাই।

মির্জা মাসুমের বিরম্নদ্ধে চাঁদার মামলা করলে সে আমাকে ছাড়বে কেন?

তার এখন কিছুই করার ড়্গমতা নেই। একটু থেমে সিনিয়রজন বলল, সে এখন জেলে। আগামী বিশ বছর সে জেল খাটলে আপনার বিরম্নদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়াবার কেউ থাকবে না। আপনি ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে দেবেন।

ভাই! এসব ঝামেলার মধ্যে যেতে আমার মন চায় না।
ঝামেলা কোথায়? সিনিয়রজন সাহস যোগাতে বলল, আমরা তো আছি।
কিন্তুু আপনারা তো সব সময় থাকবেন না।
সব সময় থাকব না মানে? চোখ পাকিয়ে তাকাল কনিষ্ঠজন, কি বলতে চান আপনি ?
স্যার! দয়া করে আমাকে আপনারা এ বিপদ থেকে রড়্গা করম্নন।

বিপদ বলছেন কেন! হয় আপনি মির্জা মাসুমের বিরম্নদ্ধে চাঁদা নেয়ার অভিযোগ আনবেন। নইলে আপনার বিরম্নদ্ধেই চাঁদা নেয়ার অভিযোগ করার লোকের অভাব হবে না। মধ্যবর্তীজন কথাগুলো বলে গ্যাট হয়ে বসে রইল।

বিপদের মুহূর্তে গাজী জাফরের সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে আবু গালিবকে। ওদের তিনজনকে চা-নাশতা খেতে বসিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে আবু গালিবকে ফোন করল সে। সব শুনে আবু গালিব বলল, ওদেরকে কিছু চাঁদা ধরিয়ে দিলেই হয়।

মানে ?
তিনজনকে হাজার তিরিশেক টাকা দিয়ে দিলে আর কোন সমস্যা হবে না।
অত কম টাকায় কি ওরা রাজী হবে?
তাহলে হাজার পঞ্চাশ টাকা ধরিয়ে দিন। দু’জন পনের হাজার করে, সিনিয়র বিশ হাজার।

ব্যাপারটার যে এত সহজ সমাধান হবে, ভাবতে পারেনি গাজী জাফর। টাকা পেয়ে যেন নেচে নেচে চলে গেল ওরা। যাওয়ার সময় বলে গেল, ব্যাপারটা নিয়ে সে যেন কারো সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে। তাহলে খবর আছে। এই পঞ্চাশ হাজার টাকা আসলে তাদের সম্মানী, এটা চাঁদা বলে মনে করা উচিত হবে না।

ওরা চলে যাওয়ার পর গাজী জাফরের মনে হল, লোকগুলো আসলে কে ? ওদের কোন পরিচয় জিজ্ঞাসা করা হয়নি। পরিচয় জিজ্ঞাস করার মতো মনের সাহস সঞ্চয় করতে পারেনি সে। যদি ভুয়া পার্টি হয়ে থাকে তাহলেও করার কিছু নেই। ওদের ব্যাপারে কারো কাছে খোঁজ-খবর করতে যাওয়ার মানে নতুন করে বিপদ ডেকে আনা।

দেশের অবস্থা নতুন মোড় নিয়েছে। জরম্নরি অবস্থায় রাজনীতিবিদদের যা-ই হোক, ব্যবসায়ীদের জন্য ভয়ের কিছু নেই। তলে তলে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছে সরকার। আজকাল ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সরকারের সঙ্গে সখ্যসূত্রে আবদ্ধ। জিনিষপত্রের দাম কমছে না বলে জনসাধারণ যতই অভিযোগ করম্নক, সরকার বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে ব্যবসায়ীদের পড়্গে সাফাই গাইছে। সরকারের এমন সহানুভূতিশীল ভুমিকা খুুবই ভালো লাগে গাজী জাফরের। এমন ব্যবসা-দরদী সরকার এর আগে আর দেখা যায়নি। প্রথম দিকে নিজের ব্যবসায়ে কিছু মন্দা ভাব থাকলেও চাল, ডাল ও তেলের উচ্চমূল্য স্থিতিশীল হওয়ায় আগের লোকসান পুষিয়ে নেয়া যাচ্ছে। এ সরকারের মেয়াদ কেন যে পাঁচ বছর করা হল না, তা ভেবে মনোকষ্টের শেষ নেই তার।

আরো কিছুদিন পরে বোঝা গেল এ সরকার রাজনীতি বিরোধী মোটেই নয়। তবে রাজনীতিকে নতুন পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখতে চায় সরকার। নতুন ধারার রাজনীতির ব্যাপারে তাদের আগ্রহ এখন আর অপ্রকাশিত নেই। এ জন্যই জরম্নরি অবস্থার মধ্যেও কয়েকটি নতুন দল তৈরি করতে বাধা দেয়নি সরকার। বরং তাদের উৎসাহিত করেছে। গাজী জাফর ভেবেছিল এমন একটা দলের মধ্যে ঢুকে যাবে কি না! কিন্তু আবু গালিব তা নিয়ে ঘোরতর আপত্তি তুলল। তার মতে সামনের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর চেয়ে সুশীল সমাজের প্রার্থীর সম্ভাবনা বেশী। জাতীয় সুশীল সমাজ সংগঠনটিকে আরো শক্তিশালী করতে পারলে ভবিষ্যতে তার মনোবাঞ্ছা পূরণ হবে। সে সম্ভাবনা এখন প্রচুর।

এরপর শুরম্ন হল জাতীয় সংলাপ। প্রথমে প্রাক- সংলাপ করে মূল সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি করা হল। রাজনৈতিক নেতারা দলে দলে সংলাপে অংশ নিলেন। লাল নীল কত কথা বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকল। কত মত কত পথ তাদের। কেউ বলে উত্তর, কেউ বলে দড়্গিণ, কেউ বলে পূর্ব, কেউ বলে পশ্চিম। সরকারের উপদেষ্টারা তাদের মাঝখানে বসে চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন। উপদেষ্টাদের পড়্গ থেকেও কথামালার মালা গেঁথে জাতিকে উপহার দেয়া অব্যাহত থাকল। এসব কথার কোন শেষ নেই। জাতিকেও আশ্বসত্ম করা হল কথামালার এই আদান প্রদান হচ্ছে চলমান প্রক্রিয়া, তা কোনদিন শেষ হবে না।

প্রায় আকস্মিকভাবে আরেকটা ঘটনা ঘটে গেল গাজী জাফরের জীবনে। দু’জন সুবেশী ভদ্রলোক একদিন তার অফিসে সাড়্গাৎ করতে এল। নিজেদের পরিচয় দিল “আপনাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ” সংগঠনের সদস্য হিসাবে। এ নামে কোন প্রতিষ্ঠানের কথা গাজী জাফরের জানা ছিল না। কিন্তুু ওদের সঙ্গে কিছুড়্গণ কথা বলার পর তার মনে হল, করম্নণাময়ের অপার করম্নণায় তার কাছে দুজন দেবদূতের আবির্ভাব ঘটেছে।

আপনি আমাদের কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড। সাদা স্যুটধারী বলল, আপনাকেই খুঁজছি আমরা।
আমি কি করলাম? রীতিমত ঘাবড়ে গেল গাজী জাফর।
কিছু করেননি, ভবিষ্যতে করবেন। হাসি হাসি মুখে বলল কালো স্যুটধারী।
আমি আপনাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।

সবই বুঝতে পারবেন। সাদা স্যুটধারী জানাল, কথা তো শুরম্নই হয়নি এখনো। বুঝবেন কি করে ? তার আগে আপনি নিজের সম্পর্কে কিছু তথ্য দেন। আমরা আপনার বিষয়ে বিশদভাবে জানতে চাই।

বলুন কি জানতে চান?
আপনি তো জাতীয় সুশীল সমাজের সভাপতি?
হ্যাঁ।
এ প্রতিষ্ঠানটি কতখানি সংগঠিত ? বলল সাদা স্যুট।
খুব বেশী নয়।
ভালো। সুশীল সমাজ তো রাজনৈতিক দল নয় যে খুব বেশী সংগঠিত হবে। জানাল কালো স্যুট।
সাদা স্যুট আবার বলল, আপনার রাজনৈতিক অতীত আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলুন।
রাজনীতি নিয়ে আমি আর আশাবাদী নই।
চমৎকার! কালো স্যুটের প্রশ্ন, কিন্তু কেন?
দু’বার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেল করেছি। খুবই কম মার্জিনে।
আরো চমৎকার! সাদা স্যুট কথাটা শুনে যেন খুশী হল। বলল, তার মানে আপনি রাজনীতিতে আছেন, আবার নেই ও।
তা বলতে পারেন।
এবার নির্বাচনের সময় আপনার কি হল?
সামান্য কারণে আমার প্রার্থিতা পদ বাতিল করা হলো। আসলে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী মির্জা মাসুমকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে জেতানোর জন্য। সে এখন জেলে ।

আমরা তার কথা জানি।
আমি সৎ আর যোগ্য বলে আজ আমার এই হাল।

আপনি হাল ছাড়বেন না। আমরা আছি না? সাদা স্যুট বলল, এবার আমরা আপনাকে নির্বাচনে দাঁড় করাবার কথা ভাবছি। সৎ আর যোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করাই আমাদের কাজ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন কি আদৌ হবে? কণ্ঠে একরাশ হতাশা ছড়িয়ে বলল গাজ’ী জাফর।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে আপনি ভাবছেন কেন? ওটা হলে বা নাহলে আপনার কি?
আমি তো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য, মানে এমপি হওয়ার জন্য-

সাদা স্যুট ও কালো স্যুট পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুখ টেপাটেপি করল বোধ হয়। কালো স্যুট বলল, আমরা আপনাকে বিভাগীয় পর্যায়ে মেয়র নির্বাচনের জন্য ভাবছি। সেটা কেবিনেট মন্ত্রীর সমান পদ।

সত্যি ! নিজের আনন্দ গোপন রাখতে পারল না গাজী জাফর !

উঠে যাওয়ার সময় সাদা স্যুট বলল, আপনি নিশ্চয়ই মেয়র হবেন। একটা কথা মনে রাখতে হবে আপনাকে। এখন থেকে আপনার সব কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা যেন বজায় থাকে।

ওরা চলে যাওয়ার পর আবু গালিবকে মোবাইল করে ডেকে আনল গাজী জাফর। এত আনন্দ একা বয়ে চলা যায় না। আবু গালিবও খবর শুনে খুশীতে আত্মহারা। ‘পলিটিক্যাল এডভাইজার টু মেয়র,’ কথাটা কেমন কানে লাগছে। মেয়রের পদ কোন রাজনৈতিক পদ নয়। সুতরাং ‘এডভাইজার টু অনারেবল মেয়র’ পদটা ঠিক মানানসই। এহেন স্বপ্নপূরণ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। অক্টোবরের মধ্যে মেয়র নির্বাচন সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যায়।

আবু গালিবকে সঙ্গে নিয়ে মেয়র পদের নমিনেশন পেপার জমা দিতে গিয়েছিল গাজী জাফর। এক গাদা কাগজপত্র সঙ্গে জমা দিতে হবে বলে সেগুলো নিয়ে তারা উভয়েই দিশাহারা। আইন অনুযায়ী আটটি বিষয়ে ব্যক্তিগত তথ্য প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই আট বিষয় সম্পর্কে ফরমে কিছুই পূরণ করেনি গাজী জাফর।

উপনির্বাচন কমিশনার নমিনেশনের কাগজপত্র উল্টেপাল্টে দেখে বললেন, আপনি নিজের সম্পর্কে তথ্যাবলি প্রদান করেননি কেন?

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে।
মানে?

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে গেলে ওসব তথ্য জানানো সঙ্গত হবে না। গাজী জাফর বলল, ব্যক্তিগত তথ্যাদির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাক, তা আমি চাই না।

মাহবুব তালুকদার

ত্তথ্যসূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক [সেপ্টেম্বর ২৯, ২০০৮]

Leave a Reply

Archives

 

October 2008
S S M T W T F
« Sep   May »
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Blog Stats

  • 942 hits